মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৫ পূর্বাহ্ন , ই-পেপার
শিরোনামঃ
মহানবী (সা.)-এর উদারতা কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে ৫০০ বছরের পুরনো শদাইশাহ (রা.) মাজার নড়াইলে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কুপিয়ে-পিটিয়ে গুরুতর জখম টাঙ্গাইলে জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত, শ্রেষ্ঠ ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন রাঙ্গাবালীতে জেলে চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, টাকা আদায়ের ক্ষোভ বাঞ্ছারামপুরে গ্যাস সিন্ডিকেটবিরোধী অভিযান, ১৩ ডিলারকে জরিমানা তৃণমূলের আস্থা সাজ্জাদ মুন্নার হাতে, ছাত্রদলের নেতৃত্বে দেখার দাবি কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর শোক কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর শোক জ্বালানি সংকটে রোববার থেকে নতুন অফিস সময়সূচি

মহানবী (সা.)-এর উদারতা

সংগ্রাম প্রতিদিন ডেক্স
  • আপলোডের সময় : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬
Oplus_16908288

✍️এম আতাউর রহমান পীর-

…………….মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের চরিত্র ও আদর্শ যুগের সীমা অতিক্রম করে চিরকাল মানুষকে পথ দেখায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেমনই এক অনন্য মহামানব। তাঁর জীবন ছিল মানবিকতা, ন্যায় ও করুণার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাঁর অসংখ্য গুণের মধ্যে উদারতা ছিল অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলেছে।

মহানবী (সা.)-এর উদারতা শুধু দানশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা বিস্তৃত ছিল ক্ষমা, সহানুভূতি, ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ ও সম্মানবোধের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। তিনি এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে শক্তি ও সম্পদই ছিল মর্যাদার মানদণ্ড। সেই সমাজেই তিনি উদারতার এক বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা মানবতার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
নবী করিম (সা.) মানুষের মাঝে কোনো ভেদাভেদ করতেন না। ধনী-দরিদ্র, বন্ধু-শত্রু, মুসলিম-অমুসলিম—সবার প্রতিই তাঁর আচরণ ছিল সমান মানবিক। তাঁর কাছে মানুষ ছিল সর্বাগ্রে মানুষই। তিনি কখনো সাহায্যপ্রার্থীকে ফিরিয়ে দিতেন না। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, অনেক সময় তাঁর ঘরে চুলা জ্বলত না, তবুও কেউ সাহায্য চাইলে তিনি খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না (সহিহ মুসলিম)।
দারিদ্র্য তাঁর উদারতাকে কখনো সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। বরং অভাবের মাঝেই তাঁর উদারতা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। একবার এক ব্যক্তিকে তিনি এমন একটি ছাগলের পাল দান করেন, যা দুই পাহাড়ের মাঝের উপত্যকা ভরে যায়। এ ঘটনা তাঁর আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা ও দানশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নিজের প্রয়োজন উপেক্ষা করে অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাব। আহলে সুফফার দরিদ্র সাহাবীদের জন্য তিনি সদা চিন্তিত থাকতেন। কুরআনে বলা হয়েছে: “তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়” (সূরা হাশর: ৯)—যা নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের জীবনে বাস্তব রূপ পেয়েছিল।
নবী (সা.)-এর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি নিজেই নিজের কাজ করতেন, সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন এবং সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশতেন। তাঁর এই আচরণ সমাজে সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তি স্থাপন করে।
রমজান মাসে তাঁর উদারতা আরও বৃদ্ধি পেত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “রমজানে তাঁর দানশীলতা প্রবাহমান বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছিল” (বুখারি ও মুসলিম)। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন—দান হতে হবে নিঃস্বার্থ ও গোপন; এমনকি একটি সদয় কথাও সদকা।
ক্ষমাশীলতাই ছিল তাঁর উদারতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক। তায়েফের নির্মম নির্যাতনের পরও তিনি তাদের জন্য ধ্বংস কামনা করেননি। বরং তিনি বলেছেন, “আমি রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর শত্রুদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে মানব ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
নবী (সা.) অমুসলিমদের প্রতিও ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও সহানুভূতিশীল। তিনি ঘোষণা করেন, কোনো অমুসলিমের ওপর জুলুম করা হলে কিয়ামতের দিন তিনি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন (আবু দাউদ)। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মানবাধিকারের এক অনন্য ভিত্তি।
তাঁর মানবিকতার উদাহরণ অসংখ্য। অসুস্থ ইহুদি কিশোরকে দেখতে যাওয়া, অমুসলিমের জানাজায় সম্মান দেখানো, বৃদ্ধার বোঝা বহন করা—এসব ঘটনা প্রমাণ করে, তাঁর উদারতা ছিল সর্বজনীন।
যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি মানবিকতা বজায় রেখেছেন। বন্দীদের সঙ্গে সদাচরণ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব ছিল তাঁর আদর্শ। এমনকি এক বেদুইনের অজ্ঞ আচরণেও তিনি কোমলতা প্রদর্শন করে শিক্ষা দিয়েছেন—মানুষকে সংশোধন করতে হলে সহানুভূতিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
পরিবারেও তিনি উদারতার শিক্ষা দিয়েছেন। কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে দুনিয়াবি স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক শক্তির শিক্ষা দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন—প্রকৃত সমৃদ্ধি আত্মিকতায়।
মহানবী (সা.)-এর উদারতা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। আজকের বিভক্ত ও স্বার্থপর বিশ্বে তাঁর এই আদর্শ আমাদের জন্য আলোর দিশারি। ব্যক্তি জীবনে তা গ্রহণ করলে হৃদয়ে শান্তি আসে, সমাজে তা প্রয়োগ করলে সৃষ্টি হয় সৌহার্দ্য, আর রাষ্ট্রে তা বাস্তবায়ন করলে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়ভিত্তিক মানবিক ব্যবস্থা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর উদারতার আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।

✍️ লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর-মদন মোহন কলেজ, সিলেট-এর সাবেক প্রিন্সিপাল।

দয়া করে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..