আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির উদ্দেশে দেন তার ঐতিহাসিক ভাষণ, যা পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
সেদিন শুধু পাকিস্তান নয়, সারা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল ঢাকার দিকে। ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন দেশে থাকা দূতাবাসগুলো ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবার মুখে ছিল একটাই প্রশ্ন—বঙ্গবন্ধু কি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন?
৭ মার্চের সকাল থেকেই ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের শহরে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ হেঁটে, বাস, লঞ্চ কিংবা ট্রেনে করে ছুটে আসেন রেসকোর্স ময়দানে। মানুষের হাতে ছিল মুক্তির প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। মানুষের ঢলে সেদিন রেসকোর্স ময়দান রূপ নেয় জনসমুদ্রে।
বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও হাতাকাটা কালো কোট পরে দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আকাশ-কাঁপানো স্লোগান ও মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে তিনি হাত নেড়ে অভিবাদন জানান উপস্থিত লাখো জনতাকে। এরপর শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ।
সেদিনের ভাষণের প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি উচ্চারণ পরাধীন বাঙালি জাতিকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। রেসকোর্স ময়দানে ঠিক কত মানুষ উপস্থিত ছিলেন তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন সেখানে বাঙালি জাতির প্রতিবাদ ও দ্রোহের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল।
সমাবেশে অসংখ্য নারীও অংশ নেন। অনেকের হাতে ছিল বাঁশের লাঠি, কেউ কেউ তীর-ধনুকও বহন করছিলেন। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘মা-বোনেরা অস্ত্র ধরো’। যা স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রস্তুতিরই প্রতীক ছিল।
রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচারের প্রস্তুতি নিয়েছিল ঢাকা বেতার। প্রচার শুরু হলেও সামরিক কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দেয়। প্রতিবাদে বেতারের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতার ভবন ত্যাগ করেন এবং সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। পরে গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।
বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের আহ্বানেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। পরে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান ও আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।
২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্য দিয়ে ভাষণটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়। এর আগে বিবিসির এক জরিপে এই ভাষণকে বিশ্বের সর্বকালের সেরা ভাষণগুলোর অন্যতম হিসেবে স্থান দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজও বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণার অনির্বাণ শিখা হয়ে সাহস ও শক্তি জুগিয়ে চলেছে।