রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১:৪০ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
গোপালগঞ্জে সাংবাদিক পুত্র হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবীতে মানববন্ধন নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় লোহাগড়ায় বাড়ি-ঘর ভাঙচুর, লুটপাট গুরুতর আহত দু’জনকে ঢাকায় প্রেরণ বাগেরহাটের রামপালে পুলিশের পৃথক অভিযানে দুই মাদক কারবারি আটক ফটিকছড়ি সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোটার্স ইউনিটির সভা অনুষ্ঠিত। রামপালে পিক-আপের ধাক্কায় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিহত লোহাগড়া বাজারে দুটি মোবাইলের দোকানে দুর্ধর্ষ চুরি, মোবাইলসহ অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরি  আনার হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত এম পি আনারের দেহাংশ উদ্ধারে কসাই জিহাদকে রিমান্ডের আবেদন  মোংলা থানার ওসির অপসারনের দাবীতে বাগেরহাটে মানববন্ধন চবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২৩ তম সভাপতির দায়িত্বে জনাব মুহিউদ্দিন আহমদ।

পরীমনি, আদনান ও সিলেক্টিভ প্রতিবাদ

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১

১৩ জুন ২০২১ গভীর রাতে যখন ফেসবুক খুলি, দেখি এক বন্ধু মেসেঞ্জারে জানতে চেয়েছে- ‘পরীমনির কী হয়েছে? লাইভ দেখলাম। প্রেস কনফারেন্সে দেখলাম নাসির তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করতে চেয়েছে বোট ক্লাবে।’ আমি একটু বিরক্তই হয়েছিলাম, প্রথমত আমি কিছু জানি না তখনও। আর সে যদি প্রেস কনফারেন্স দেখেই থাকে আমার কাছে কেন জানতে চাচ্ছে বরং আমাকে ঘটনা শেয়ার করতে পারে। তাকে বললাম যে নিউজটা চোখে পড়লে পড়ে জানাবো।

পরে দেখলাম আমার বন্ধুদের অনেকে ফেসবুকে পরীমনি পরীমনি করছে। খবর পড়তে গিয়ে দেখলাম, অভিযুক্ত এই নাসির ইউ আহমেদ আমার পরিচিত, উত্তরা ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট। আমার ফেসবুকেও ফ্রেন্ড হিসেবে আছেন তিনি। উনার ওয়ালে এ-সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য আছে কিনা চেক করলাম। না, নেই।

ঘটনার দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো আমার জন্য জটিল হয়ে পড়ায় এটা নিয়ে মাথা ঘামাতে চাইনি। তার প্রধান কারণ পরীমনি এবং নাসির সাহেব যে সোসাইটিতে চলেন, সেখানে আমার আনাগোনা কম। নাসির সাহেবের সঙ্গে আমার কয়েকবার কর্মসূত্রে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, কথা হয়েছে। তিনি আমার অফিসেও এসেছিলেন টকশোতে অংশ নিতে। আমি তার উত্তরা ক্লাবেও গিয়েছি। সে কারণে তার সম্পর্কে আমার যেটুকু অবজারভেশন তাতে এই ঘটনাবলি, পরীমনির অভিযোগ আমার কাছে কিছুটা বেখাপ্পা মনে হয়েছে।

একটি টিভিতে কর্মসূত্রে পরীমনির সঙ্গেও আমার দু’বার দেখা হয়েছে, সেই টিভির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও তিনি ছিলেন কিন্তু কথা হয়নি। তবে মিডিয়ায় তার জীবনযাত্রার যে চিত্র দেখি এর সঙ্গে শিল্পী হিসেবে তার আয়ের সুস্পষ্ট অসঙ্গতি থাকায় খবরটি যখন মিডিয়ায় আসে, ওই ধরনের ঘটনায় আমি খুব একটা আশ্চর্য হইনি। প্রেস কনফারেন্সে তাকে ঘিরে কারও কারও উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরও জটিলভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে আমাকে। তবে তার জীবনযাত্রা, চলাফেরার স্টাইলে আমার কোনো আপত্তি নেই। তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি।

পরীমনির অভিযোগে অভিযুক্তরা মামলা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। এটি অনেকের সাধুবাদ কুড়িয়েছে; তবে পুলিশ এতো বেশি সক্রিয় যে তাড়াহুড়োয় তাদের কিছু কাজ সাজানো বলে সন্দেহ করছে মানুষ। এমন একটা সময়ে এমন একজন ব্যক্তি মদ, ইয়াবা, `রক্ষিতা’ বাসায় রাখবেন– হজম করা কঠিন।

বিদেশি ধনিকশ্রেণি তাদের ধন কীভাবে জনকল্যাণে ব্যবহার করা যায়, কীভাবে মানবকল্যাণে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা যায়, শিক্ষা-সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের অমর করা যায়- সেটা নিয়ে চিন্তা করেন। আমাদের ধনীরা ধন হলে সিংগভাগ প্রথমেই সেক্স আর মদ নিয়ে ভাবেন, বড় বড় ক্লাবের মেম্বার হন। ঢাকায় যত বড় বড় সোশ্যাল ক্লাব আছে তার ৫০% মেম্বার আবার প্রত্যেকটি ক্লাবেরই মেম্বার। এতেই বোঝা যায় যে ক্লাব কালচার ধনীদের কীভাবে সংক্রমণ করেছে।

একজন ব্যক্তিকে প্রত্যেকটি ক্লাবের মেম্বার হতে হবে কেন! রিক্রিয়েশনের জন্য কি প্রতিদিন নতুন নতুন ক্লাবে যেতে হবে তাকে! আবার, অন্যের ক্লাবে যাবেন কেন, এ কারণে এসব ধনীদের কেউ কেউ নিজেরাই নতুন নতুন ক্লাব খুলে বসেছেন। মদের লাইসেন্স নিচ্ছেন। তাদের ক্লাবে মেম্বার করছেন সমমনা বা অধীনস্ত শ্রেণিকে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেহারে এখানে বিনোদন বলতে কিছুই নেই। এমনকি উঠতি ধনীদের বিনোদনের জন্য একটি সোসাইটিতে যে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট থাকা দরকার তার কিছুই নেই। ঢাকা শহরে এরা সামান্য জুয়া খেলার সুযোগ পায় না বলে দেশের বাইরে যায়। ফুর্তি করতেও দেশের বাইরে যেতে হয় তাদের। দেশের টাকা বিদেশে চলে যায়।

খুব অস্বস্তিকর শোনালেও বলতে হয়, যে পরিমাণ ‘সোসাইটি গার্ল’ এখানে আছে ধনীর পরিমাণ তার থেকে অনেক বেশি। ফলে যেকোনো স্ক্যান্ডালে দু-চারজন নায়িকা, মডেল বা পিয়াসা জাতীয় নারীদের নাম ঘুরে ফিরে আসে। এদের নিয়েই ধনীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি। রক্ষিতা করা নিয়ে মারামারি। এসব ধনী ঐতিহাসিক নগর-বনিতা আম্রপালির যুগের ক্ষমতা পেলে নিজেরা মারামারি না করে এই ক’টি সোসাইটি গার্লকে সার্বজনীন ডিক্লেয়ার করে সবাই ভোগ করতো। তার ফি নির্ধারণ করে দিতো।

এবার পরীমনি প্রসঙ্গের ভিন্ন একটি দিক নিয়ে কথা বলা যাক। পরীমনির সংবাদ যখন বিভিন্ন অনলাইনে আসে আমি খেয়াল করি দেখি যে সেখানে কিছু লোক মন্তব্যের ঘরে সাংবাদিকদের গালাগালি করছে। তাদের অভিযোগ পরীমনির ঘটনা দিয়ে মিডিয়া একজন কথিত ইসলামী বক্তার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটিকে গায়েব করে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ইসলামিক স্কলার’ খ্যাতি পাওয়া রংপুর মহানগরীর সেন্ট্রাল রোড এলাকার বাসিন্দা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান (৩১) ও তার তিন সফরসঙ্গীর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে মিডিয়া সংবাদ করছে না। তার পারিবার অভিযোগ করেছে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৩৭ মিনিট রাজধানীর গাবতলী এলাকায় থাকলেও এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মিলছে না। ওই সময় তিনি রংপুর থেকে ঢাকায় আসছিলেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না আমাকেও ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন ইনবক্স করে অনুরোধ করেছেন এটা নিয়ে আমি যেন কিছু লিখি। আমি কী লিখব সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। কারণ যাকে নিয়ে লিখব তার সম্পর্কে তো আমার জানা দরকার। এই কথিত ইসলামী বক্তা সম্পর্কে আমার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। কারণ আমি ইউটিউব মোল্লাদের ভিডিও দেখি না। আদনানেরও কোনো ভিডিও দেখিনি কোনো দিন। তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বা গুম হওয়ার পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে কিনা তার হদিসও আমি জানি না।

আমাদের একশ্রেণির লোকের ধারণা হয়েছে, কেউ নিখোঁজ হলে তার সঙ্গে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক আছে। জেনে হোক বা না জেনে হোক তারা এ ধরনের সমীকরণ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ ইঙ্গিত করছেন আদনানের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ঘটনার আটদিন পার হলেও এখন পর্যন্ত আদনানের ভাগ্যে কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে তার হদিশ কোনো মিডিয়ায় পাইনি আমরা। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা এটা নিয়ে শোরগোল পাকাচ্ছেন তারাও সুনির্দিষ্ট করে কী কারণে তাকে গুম করা হবে বা নিখোঁজ বানিয়ে দেবে তার কোনো যুক্তি দিতে পারছে না।

আমাকে পাঠানো একটা ভিডিও আমি দেখেছি যেখানে সাধারণ শিক্ষা এবং মাদরাসা শিক্ষা- দুটিরই সীমাবদ্ধতা নিয়ে আদনান কথা বলেছেন। তাকে আমার মহাপণ্ডিত কিছু মনে না হলেও বোকা মনে হয়নি। একজন বক্তা হিসেবে জঙ্গিবাদ কিংবা এই জাতীয় কর্মকাণ্ডে তিনি উৎসাহ দেন কিনা জানি না। তবে তার নিখোঁজের কারণ যাই হোক না কেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার হদিস করা, তাকে সামনে আনা। রাষ্ট্রযন্ত্র যদি তাকে গ্রেফতারও করে থাকে তাকে আইন-আদালতের মুখোমুখি করা হোক। কারণ একজন জঙ্গিরও আইনের মুখোমুখি হওয়ার অধিকার আছে, যদি সে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হয়ও।

পরীমনির ঘটনা যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে তার থেকে কম প্রচার করেনি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া। সেই সঙ্গে তার এই কাভারেজ তুলনায় আসছে কয়েক দিন আগে ঘটে যাওয়া মুনিয়া হত্যার ঘটনার সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, মুনিয়া হত্যার ঘটনায় বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হলেও সেটার সংবাদ যথাযথভাবে মিডিয়ায় আসেনি। ফলোআপ আসেনি বরং বিকৃত সংবাদ করে মুনিয়ার চরিত্র হননের চেষ্টা হচ্ছে। দুই ঘটনার একটিতে মিডিয়ার পক্ষপাত যেমন স্পষ্ট তেমনি আরেকটিতে মিডিয়ার ভূমিকা ন্যক্কারজনক, এটাই তাদের ভাষ্য।

লোকজনের ভাষ্যকে একেবারে ফেলে দেয়া যাচ্ছে না। কারণ পরীমনির ঘটনায় মিডিয়ায় যাদের অ্যাকটিভ দেখা যাচ্ছে মুনিয়ার ঘটনায় তাদের অনেকে চুপ ছিলেন। ঠিক একই কাণ্ড ঘটছে আদনানের বেলায়ও। আদনানের ঘটনা নিয়ে যারা তোলপাড় করতে চাচ্ছেন, যারা নিন্দা জানাচ্ছেন, এই লোকগুলোই যখন বাংলাদেশের জঙ্গিরা একের পর এক ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে হত্যা করেছে তখন হাততালি দিয়েছে। ব্লগারদের হত্যাকে জায়েজ বলে প্রচার করতে চেয়েছে। দু’পক্ষই এখানে সিলেক্টিভ বিপ্লবী প্রমাণ দিয়েছে। যখন তাদের স্বার্থে লাগে তখনই তারা সক্রিয় হয়, মানবতার কথা বলে। কিন্তু অন্যের মানবতা হরণে, অন্যের অধিকার হরণে, বাকস্বাধীনতা হরণের সময় তারা চুপ থাকে।

রাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে হলে তার সব অঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। একটি সমাজকে এগিয়ে যেতে হলে একইভাবে সমাজের সব মাথা বিচার বিবেচনাবোধ সমান থাকতে হবে। পক্ষপাতিত্ব, একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি সবজায়গায়ই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। আজ আপনি যার দুঃখে হাসছেন, যার হত্যা-গুমকে আপনি জায়েজ করতে চাচ্ছেন আগামীকাল একই ঘটনা আপনার সঙ্গেও ঘটবে। তখন আপনার অতীত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে। সুতরাং সিলেক্টিভ বিপ্লবী, সিলেক্টিভ প্রতিবাদকারীরা সাময়িক শোরগোল তুলতে পারেন সত্য, তবে সেটি একটি সুস্থ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। anisalamgir@gmail.com

দয়া করে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..