কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের পর নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আইফোন ছিনিয়ে নিতে নয়, বরং ধার নেওয়ার টাকা ফেরত চাওয়ায় অপ্রতিমকে হত্যা করেছেন তুহিনসহ কিশোর গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা।
কুবি‘র বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তুহিন অপ্রতিমের বাবার দোকানে চাকরি করতেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘কিং অব কোটবাড়ি’ কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য জানিয়েছেন, এক মাস আগে দোকানে চাকরিরত অবস্থায় তুহিন নেশাদ্রব্য কেনার জন্য অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নেন। সেই টাকা ফেরত চাওয়ায় তুহিনের নেতৃত্বে অপ্রতিমকে হত্যা করা হতে পারে।
কিশোর গ্যাংয়ের সেই সদস্য আরো জানান, তুহিনের সঙ্গে এক বছর ধরে অপ্রতিমের সম্পর্ক ছিল। নিয়মিত অপ্রতিমের বাসায় পার্টি হতো। মোটরসাইকেল নিয়ে লালমাই পাহাড় এলাকায় ঘুরতে যেতেন তারা। স্থানীয় কিশোর গ্যাং ‘কিং অব কোটবাড়ি’র গ্রুপ লিডার ছিল তুহিন। ওই গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিত অপ্রতিম। স্থানীয় এক বিএনপি নেতা এ গ্রুপের দেখভাল করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ‘কিং অব কোটবাড়ি’ গ্রুপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই গ্রুপের একাধিক ছবিতে অপ্রতিমকে দেখা গেছে। গ্যাং সদস্যদের মোটরসাইকেল মহড়াতেও তাকে দেখা গেছে।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাওনা ৫ হাজার টাকা ফেরত নিতেই শুক্রবার জুমার নামাজের পর তুহিনের সঙ্গে দেখা করে অপ্রতিম। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যান তুহিন। পরে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। তুহিন টাকা দিতে পারবেন না বলে জানালে অপ্রতিম তুহিনকে ধাক্কা দেয়। পরে তুহিন সেখানে বাঁশের লাঠি দিয়ে কয়েকবার মাথার পেছনে আঘাত করেন। সেখানে অন্য তিন-চারজন উপস্থিত ছিল বলে জানা গেছে। অপ্রতিম আহত হলে তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে তুহিন তার সহযোগীদের নিয়ে পালিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যরা অপ্রতিমকে খোঁজা-খুঁজি করার সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন তুহিন। শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের সময় তুহিনসহ সেই কিশোর গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে একাধিক ভিডিও শেয়ার দেন।
অপ্রতিমের বাবার করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়ার সময় কর্মকর্তারা জানতেন না যে, অপ্রতিম মারা গেছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ পাওয়ার খবর পান তারা।
তদন্তকারীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডের কথা অস্বীকার করলেও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে, অন্যদের নাম বলতে চাননি তিনি। অন্যদের নাম প্রকাশ না করতে তিনি ‘ওয়াদাবদ্ধ’ ছিলেন বলে জানিয়েছেন। এ সময় তার মোবাইল ফোনে বারবার ফোন আসছিল।
তার ফোনে কল করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা আরেক কিশোর। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এলে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। এ সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। এর পর তুহিন আরেকজনের নাম জানালে তাকেও পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আইফোনের নয়, মূলত ৫ হাজার টাকা ধার দেওয়া নিয়ে বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করতেন তুহিন। তাকে ৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সে টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, টাকা ফেরত চাওয়ায় অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিলেন তুহিন। অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না, এমন চিন্তা তৈরি হয় তার মধ্যে। এ ভাবনা থেকে অপ্রতিমকে হত্যা করা হতে পারে বলেও ধারণা তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে, অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা। এর সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ড. কামরুন নাহাত শীলা। তিনি বলেছেন, “ম্যাডাম (নাহিদা বেগম) চান, পুলিশ তদন্ত করে বিষয়টি বের করুক—কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পুলিশে সোপর্দ করার প্রতিশোধের জেরেই তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে কি না।
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে তার মরদেহ পাওয়া যায়।